
বিডি ঢাকা ডেস্ক
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, “আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী পদ্মার পানির সঠিক হিস্যা পাওয়া বাংলাদেশের মানুষের অধিকার। আমরা আশা করি, বিএনপি যদি জনগণের ভোটে দায়িত্বে আসতে পারে নিঃসন্দেহে টপ প্রায়োরিটি পাবে ফারাক্কা ব্যারেজ ইস্যু, গঙ্গা ব্যারেজ প্রকল্প, তিস্তা ইস্যু। আমরা এগুলোতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেব।”
শনিবার চাঁপাইনবাবগঞ্জে পদ্মা বাঁচাও গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে ‘পদ্মা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে সমন্বয় কমিটি’ আয়োজিত গণসমাবেশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে আবার মানুষ মারার হুমকি দিচ্ছে। তার মামলার রায়কে ঘিরে গোলযোগ সৃষ্টির পরিকল্পনা করছে। ফ্যাসিস্ট শক্তি যেন আর মাথাচাড়া দিয়ে দেশের ক্ষতি করতে না পারে, সেজন্য সকলকে সৈনিকের মতো ভূমিকা রাখতে হবে।”
জামায়াতকে ইঙ্গিত করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “দেশের এই সংকটকালে একটি দল সংকটকে আরো গভীর সংকটে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা সবাই মিলে সংস্কারের সনদ সই করলাম পার্লামেন্টের সামনে। এখন হঠাৎ করে সেই দলটি বলতে শুরু করেছে, আমাদের পিআর দরকার। যে জিনিস বাংলাদেশের মানুষ বোঝে না, সেই জিনিস মানুষের ঘাড়ের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে কার ইঙ্গিতে। বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের বিশ্বাস করে না, সহজে ভোট দেবে না। গত নির্বাচনে কত পার্সেন্ট ভোট পেয়েছিল জামায়াতে ইসলাম? তারা ভোট পেয়েছিল ৫/৬ পার্সেন্ট। রাতারাতি লাফ দিয়ে ৫১ পার্সেন্ট হয়ে যাবে। এটা মনে করবেন না। বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের সহজে ভোট দিবে না। কারণ আপনাদের জনগণ বিশ্বাস করে না।”
ফখরুল আরো বলেন, “পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে গণহত্যা চালিয়েছে জামায়াত।” তিনি বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে যে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছেন, এই নির্বাচন হতে হবে। নির্বাচনের বিকল্প নেই। কারণ নির্বাচন যত দেরি হচ্ছে বাংলাদেশ তত দুর্বল হচ্ছে।”
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য হারুনুর রশীদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত গণসমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন— চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক মো. শাহজাহান মিয়া ও সাবেক এমপি মো. মিজানুর রহমান মিনু, বিএনপির শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (গোমস্তাপুর-নাচোল-ভোলাহাট) আসনের সাবেক এমপি আলহাজ আমিনুল ইসলাম, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীন, বিএনপির ত্রাণবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন, রাজশাহী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সাঈদ চাঁদ, রাজশাহী জেলা বিএনপির সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল, বাগমারা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ডিএম জিয়াউর রহমানসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
এর আগে সকালে বিএনপি মহাসচিব চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা নদীতে নির্মিত রাবারড্যাম পরিদর্শন করেন। এসময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের মূল যে সমস্যা, তাহলো পদ্মার পানি আমরা ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছি না। তার ওপর পানি বণ্টন সংক্রান্ত যে চুক্তি আছে ২০২৬ সালে তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাবে। চুক্তি শেষ হলে কী হবে সেটা আমরা এখনো জানি না।” তিনি বলেন, “গঙ্গার পানিকে ফারাক্কায় আটকে দেয়ায় আমাদের গোটা বাংলাদেশের বিশেষ করে উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। ছোট ছোট নদী খাল সব শুকিয়ে গেছে, মানুষের জীবন-জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বারবার ভারতের সঙ্গে কথা বলার পরও তাদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি।” তিনি বলেন, “আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে প্রথম পানি চুক্তি করেন এবং তারপর আমরা কিছু পানি পাই। এরপর দেখা যায় যৌথ নদী কমিশনের সভা হয়নি। এটাও আমাদের জন্য একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এই ৩টি নদী আমাদের প্রধান নদী। পদ্মার পানি আটকে দিয়ে আমাদের মানুষের জীবন-জীবিকাকে প্রায় বিনষ্ট করে ফেলা হয়েছে। সেই কারণেই হারুনুর রশীদ সাহেবের নেতৃত্বে এভানে পদ্মা বাঁচাও আন্দোলন শুরু হয়েছে। আমরা আন্দোলনে শরিক হতে এখানে এসেছি। আমরা মানুষের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে চাই। রাজবাড়ীতে যে গঙ্গা ব্যারেজ করার কথা ছিল, সেটা যদি করা যায় তাহলে দক্ষিণাঞ্চলসহ উত্তরালের বিরাট উপকার হবে। এ কথাগুলো আমরা জনগণের সামনে বলতে চাই, আমরা জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে চাই, সচেতন করতে চাই, এই আন্দোলনটা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে চাই। কারণ এখন ক্লাইমেট চেঞ্জের বিষয়টি সামনে আসছে, প্রকৃতির পরিবর্তন হচ্ছে, তাতে আমরা যদি নদীগুলোকে বাঁচাতে না পারি, পরিবশেকে যদি রক্ষা করতে না পারি তাহলে এদেশকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।”
মির্জা ফখরুল বলেন, “সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে আমার দেশের স্বার্থ আমাকে আগে দেখতে হবে। এখানে আমাদের দায়িত্ব হবে, যে সরকারই আসুক, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দাবিগুলোকে চাপ সৃষ্টি করে আদায় করতে হবে। তবে নির্বাচিত সরকার না থাকলে গুরুত্বটা পায় না, শক্তিটা পায় না। অথবা শেখ হাসিনার মতো যদি জোর করে দখল করে সেটাও আসলে সম্ভব হয় না।”
আরেক প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন— “এখানে পানির হিস্যা, সীমান্ত হত্যা বন্ধে আমরা বেশি গুরুত্ব দিতে চাই। বিশেষ গুরুত্ব দিতে চাই আমাদের ওপর দাদাগিরি বন্ধ করা। আমরা চাই, আমাদের প্রতিবেশী দেশ, তারা ইচ্ছা করলেই আমাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখতে পারে। আমি মনে করি, ১৯৭১ সাল মুক্তিযুদ্ধের সময় তারা আমাদের সহযোগিতা করেছে, তাদের তো আরো বেশি করে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করা দরকার। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে গত এবং মোদি সরকারের আমলে দেখছি উল্টো তারা বাংলাদেশেকে চাপে ফেলেছেন, সব নিয়ে গেছেন, কিন্তু বিনিময়ে আমাদের কিছু দেয়নি।” তিনি বলেন, “হাসিনা সরকারের আমলে দেখেছেন, তারা কিছুই নিতে পারেনি। তাদের মন্ত্রীদের কথা তো আপনারা শুনেছেন, তারা দেন-দরবার করতে যায় ভারতে, স্বামী-স্ত্রীর কথা বলে।” বিএনপির মহাসচিব বলেন— দুই দেশের মধ্যে সমমর্যাদা রাখতে হবে, এদেশের স্বার্থটাকে সবার আগে দেখতে হবে।