
অনলাইন নিউজ: ‘এমন জীবন তুমি করিবে গঠন/মরণে হাসিবে তুমি কাঁদিবে ভুবন।’ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বিপ্লবী বীর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার অকুতোভয় সেনানী ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির শাহাদাত সত্যি সারাদেশের মানুষকে কাঁদিয়েছে। দেশবাসীকে কাঁদাতেই গতকাল সন্ধ্যায় জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিনে শুয়ে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরলেন শহীদ ওসমান হাদি। ঝালকাঠির এক নিভৃত পল্লীতে জন্ম নেওয়া মাদরাসায় লেখা-পড়া করা এক সাধারণ পরিবারের সন্তান, যার রাজনৈতিক পথচলা খুব অল্প সময়ের। অথচ এই অল্প সময়ের মধ্যে তার দেশপ্রেম, সততা, আগ্রাসনবিরোধী প্রতিবাদী কণ্ঠ, আদর্শিক দৃঢ়তা তাকে সকলের প্রিয়জন বা আপনজনে পরিণত করেছে। ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হাদি সকল বয়সের, সকল শ্রেণি পেশার মানুষের প্রিয় হয়ে ওঠেন। তাইতো হাদির শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে রাজধানীসহ সারাদেশ প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে পড়ে। হাদিকে হত্যার প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচিতে হাদিকে হত্যায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায় প্রতিবাদী ছাত্র-জনতা। শাহাদাতের খবর পেয়ে রাত সাড়ে ১০টায় প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে গভীর শোক প্রকাশ করেন। একই সাথে ২০ ডিসেম্বর ১ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন। গতকাল বাদ জুমা শহীদ হাদির আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বায়তুল মোকাররমসহ সারাদেশে মসজিদে মসজিদে বিশেষ মুনাজাত হয়।জুলাই যোদ্ধা শরিফ ওসমান হাদিকে একটু চোখের দেখা দেখতে এবং শ্রদ্ধা জানাতে বিমানবন্দরে শোকার্ত মানুষের ঢল নামে। আধিপত্যবাদবিরোধী কণ্ঠস্বর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ শরিফ ওসমান হাদির লাশ সিঙ্গাপুর থেকে দেশে আনা হয়েছে। পতাকায় মোড়ানো কফিনবাহী ফ্লাইট গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। এ সময় বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের নেতৃবৃন্দ বিমানবন্দরে ছুটে যান। শরিফ ওসমান হাদির লাশ বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কলেজগেট হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে হিমঘরে তার লাশ রাখা হয়েছে। আজ বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় হাদির নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ এ তথ্য জানান। ফয়েজ আহম্মদ বলেন, জানাজায় অংশগ্রহণে আগ্রহীদের কোনো প্রকার ব্যাগ বা ভারী বস্তু বহন না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হচ্ছে। একই সঙ্গে এসময় সংসদ ভবন ও আশপাশ এলাকায় ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে বলে জানান তিনি।
গতকাল বাংলাদেশ সময় বেলা ২টা ৩ মিনিটে সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৮৫ ফ্লাইটটি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বিমানটি পৌনে ৬টার দিকে ঢাকায় হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরে অবতরণ করে। এ সময় পুরো বিমানবন্দর এলাকা কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়।
ওসমান হাদির শাহাদাতের খবরে সারাদেশ প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে পড়ে। এই প্রতিবাদ শাহবাগ থেকে কাওরান বাজার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দু’টি পত্রিকা অফিসে হামলা করে প্রতিবাদী ছাত্র-জনতা। তবে হাদির এই শাহাদাতকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে যে নাশকতা করা হচ্ছে তা মোটেও কাম্য নয়। এ বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার জন্য বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য রাজনৈতিক দলগুলো দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশের সংকটময় পরিস্থিতি কাজে লাগিয়ে যারা নাশকতা সৃষ্টি করে, তারা দেশের শত্রু। তিনি দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলার প্রতিবাদ জানান। পাশাপাশি জানমাল রক্ষায় দায়িত্বের কথাও অন্তর্বর্তী সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেন।
জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান গতকাল নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেয়া এক পোস্টে বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার এক গভীর ষড়যন্ত্র চলছে এবং বিভাজনের সুযোগ নিয়েই আধিপত্যবাদ মাথাচাড়া দেয়। আজ ঐক্যবদ্ধ হতে না পারলে ওসমান হাদির স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না। তিনি প্রথম আলো, ডেইলি স্টার এবং সম্পাদক নূরুল কবীরের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানান।
এদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস গতকাল প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার সম্পাদককে ফোন করে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, সংবাদপত্র কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর হামলার শামিল। আপনাদের এই দুঃসময়ে সরকার আপনাদের পাশে আছে। তিনি সম্পাদকদের ও সংবাদমাধ্যমগুলোর পূর্ণ নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। গত ১২ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে তাঁর মাথায় গুলি করে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারের উদ্যোগে তাঁকে গত ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত পৌনে ১০টার দিকে ওসমান হাদি শাহাদাতবরণ করেন।
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা ওসমান হাদি পরে ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ গড়ে তুলে ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে আলোচনায় আসেন। বিভিন্ন টেলিভিশনের টক শোতেও নিয়মিত আমন্ত্রণ পেতে থাকেন তিনি। তার যুক্তিতর্কের অনেক ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়। গুলিবিদ্ধ হওয়ার মাসখানেক আগে হত্যার হুমকি পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন ওসমান হাদি। তিনি গত নভেম্বরে নিজের ফেসবুক পেজে বলেছিলেন, দেশি-বিদেশি অন্তত ৩০টি নম্বর থেকে তাকে ফোনকল করে এবং মেসেজ পাঠিয়ে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ওই পোস্টে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ‘খুনি’ ক্যাডাররা তাকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখছে। তবে প্রাণনাশের আশঙ্কা সত্ত্বেও ইনসাফের লড়াই থেকে পিছিয়ে যাবেন না তিনি।
ওসমান হাদিকে গুলিতে জড়িত মূল সন্দেহভাজন নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ফয়সল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর শেখ। তারা ভারতে পালিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন সূত্র।