
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অগ্র সৈনিক ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি গত বৃহস্পতিবার রাত প্রায় দশটার দিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় শাহাদাতবরণ করেছেন। ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন। গত শুক্রবার ঢাক-৮ আসনে নির্বাচনী প্রচার কাজ শেষে বিজয় নগর কালভার্ট রোড দিয়ে অটোরিকশায় যাওয়ার সময় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা তাকে মাথায় গুলি করে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং তাকে উন্নত চিকিৎসা দেয়ার জন্য সরকার সিঙ্গাপুরে নেয়ার ব্যবস্থা করে। হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশব্যাপী শোকের ছায়া নেমে আসে। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় উত্তেজিত লোকজন বিক্ষোভ করে স্থাপনায় ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করে। এর মাধ্যমে একটি জাতীয় বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা রয়েছে। পত্রিকা দুটির অফিসে ব্যাপক ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সংগঠন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি এবং নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নরুল কবির ইংরেজি দৈনিকটির অফিসে ছুটে হামলাকারিদের নিবৃত্ত করতে গেল তাকে হেনস্তা করা হয়। চট্টগ্রামে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের বাসভবনের সামনে বিক্ষুব্ধ মানুষ বিক্ষোভ ও বাসভবন লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। হাদির শাহাদাতবরণে অন্তর্বর্তী সরকার, দেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ অত্যন্ত শোকাগ্রস্থ ও মর্মাহত হয়েছে। সরকার আজ জাতীয় শোকদিবস ঘোষণা করেছে। গতকাল বাদ জুমা দেশের সকল মসজিদে দোয়ার আয়োজন করেছে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়েও প্রার্থণার আয়োজন করা হয়। আমরা জুলাই অভ্যুত্থানের এই অকুতোভয় নায়কের শাহাদাতবরণে তার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা ও শোক প্রকাশ করছি।
শরীফ ওসমান হাদির শাহাদাতবরণে স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষ শোকাচ্ছন্ন। তার প্রতি অনুরক্ত ও ভালবাসার কারণে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ হওয়াও স্বাভাবিক। তবে আগে থেকেই অনুমাণ করা হচ্ছিল, তিনি শাহাদাতবরণ করলে ক্ষোভ-বিক্ষোভ হতে পারে। হাদির গড়া ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজেও এ নিয়ে দেশ অচল করে দেয়ার মতো বার্তা দেয়া হয়। অনুমিত এ ঘটনার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, একদল মানুষের বিক্ষোভ এবং সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে, যা কোনোভাবেই কাক্সিক্ষত ছিল না। প্রিয় মানুষের মৃত্যু যে কাউকেই বেদনাহত করে। শোকে মুহ্যমান করে। তবে তা সহিংস আচরণে পরিণত হওয়া কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না। হাদির শাহাদাতবরণ নিয়ে যে ঘটনা ও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে, তা সচেতন মানুষের কাজ হতে পারে না। প্রশ্ন উঠেছে, কারা এ কাজ করল? ইনকিলাব মঞ্চ একটি সাংস্কৃতিক অ্যাক্টিভিজমের সংগঠন। মঞ্চের সাথে খুব বেশি লোকজন থাকার কথা নয়। তাহলে কারা বিক্ষোভের নামে সহিংস ঘটনা ঘটালো। তাদের এবং তাদের ইন্ধনদাতাদের খুঁজে বের করা জরুরি। বুঝতে অসুবিধা হয় না, হাদির শাহাদাতবরণকে একটি চক্র ক্ষোভ প্রকাশের নামে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে হামলা, ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ করে দেশকে অস্থিতিশীল ও অরাজক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। হাদির প্রতি কারোই ভালোবাসার কমতি নেই। তার ফ্যাসিবিরোধী ও ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী লড়াই সর্বজন প্রশংসিত। তার আদর্শকে দেশের মানুষ ধারণ করে। এর অর্থ এই নয়, তার শাহাদাতবরণে সহিংস আচরণ করতে হবে। এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ যথার্থই বলেছেন, কোনো কিছু ধ্বংস করে হাদিকে ধারণ করা যাবে না। হাদিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সু¯পষ্ট অবস্থান গ্রহণের মাধ্যমে, একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক ইস্ট্যাব্লিশমেন্ট গড়ে তুলে। আমাদের পথ ধ্বংসের নয়, পুনর্গঠনের। হাদির শাহাদাতবরণের পরপরই জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া এক ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশবাসীকে ধৈর্য্য ও শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তিনি এ কথা বলেননি, যারা বিশৃঙ্খলা, অগ্নি সংযোগ ও নাশকতা সৃষ্টি করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তাঁর ভাষণের পর ছাত্র-জনতার নামে যারা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগে মেতে উঠে, এ তথ্য তাঁর অজানা থাকার কথা নয়। গোয়েন্দারা নিশ্চয়ই তাঁকে এ তথ্য দিয়েছে। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন আসে, তাহলে এই ধ্বংসাত্মক কর্মকা- কেন ঠেকানো গেল না? এই ঠেকাতে না পারার পুরো দায় তাঁর উপরই পড়ে। যথাযথ পদক্ষেপ নিলে এ ধরনের ঘটনা ঘটানোর সাহস কেউ পেত না। এতে বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশ সম্পর্কে কী বার্তা গেল? বর্হিবিশ্ব দেখছে, বাংলাদেশে ‘আল্লাহুআকবার’ ধ্বনি দিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে, এর অর্থ দাঁড়ায় এদেশে উগ্রবাদ জোরেসোরে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এটা একটি ভুল বার্তা দিচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে উগ্রবাদের ঠাঁই নেই। এমনিতেই ভারত বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশকে উগ্রবাদীদের উত্থানের প্রপাগান্ডা বরাবরই চালিয়ে আসছে। এখন তার সহকারি হাইকমিশনারের বাসভবনে হামলার ঘটনাকে সে আরও বড় করে দেখবে এবং বিশ্বকে দেখাবে। সে যে প্রপাগান্ডা চালিয়ে আসছে, তার ভিত্তি দেবে। দেশের ভাবমর্যাদাকে ভুলুণ্ঠিত করবে। এ ধরনের ঘটনায় বর্হিবিশ্বে কূটনীতির ওপর বিরূপ ও নেতিবাচক পড়া অস্বাভাবিক নয়। অন্যদিকে, সংবাদপত্রের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা বিশ্বে এই বার্তাই দিচ্ছে, বাংলাদেশের গণমাধ্যম অনিরাপদ এবং মুক্তচিন্তা ও বাকস্বাধীনতার ওপর আঘাত হানা হচ্ছে। বিশিষ্ট সাংবাদিক নুরুল কবিরকে যে হেনস্তা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও দুর্ভাগ্যজনক। নুরুল কবির একজন সাহসী ও সৎ সাংবাদিক যিনি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সময়েও দৃপ্ত কণ্ঠে তার শাসনামলের সমালোচনা করেছেন। সে সময় তাঁর গাড়িতে হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর বাকরুদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। তাতেও তিনি দমে যাননি। হাসিনামুক্ত বাংলাদেশে তাঁকে হেনস্তা হতে হবে, এটা অকল্পনীয় ও অচিন্তনীয়। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।
পর্যবেক্ষকদের মতে, হাদির শাহাদাতবরণের জনগণের সেন্টিমেন্টের আড়ালে ষড়যন্ত্রকারিরা দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ নিয়েছে। তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চাইছে। এক্ষেত্রে সরকারের চরম ব্যর্থতা রয়েছে। দেশ এখন যে ভঙুর এবং অর্থনৈতিক শোচনীয় অবস্থার মধ্যে রয়েছে, তা থেকে উত্তরণে নির্বাচনের বিকল্প নেই। নির্বাচন যাতে না হয়, নির্বাচনবিরোধী গোষ্ঠী সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের ইন্ধনও এর পেছনে থাকা অসম্ভব নয়। আমরা আশা করি, সরকার ও নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী পরিবেশ শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল করতে কঠোর অবস্থান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। যারাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করার অপপ্রয়াস চালাবে, তাদের শক্ত হাতে দমন করবে।