বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ১০:৫৮ অপরাহ্ন

ফাতেমা বেগম এখন জাইমা রহমানের ছায়াসঙ্গী

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯ বার পঠিত
ফাতেমা বেগম এখন জাইমা রহমানের ছায়াসঙ্গী
ফটো সংগৃহিত

 অনলাইন নিউজ: বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রয়াণের শূন্যতার এক নীরব সাক্ষী তার দীর্ঘদিনের পরিচারিকা ও বিশ্বস্ত সঙ্গী ফাতেমা বেগম। তার আপসহীনতার লড়াইয়ে পর্বতের মতো অনড় থেকেছেন ফাতেমা। কারাগার থেকে দাফনের সময় কফিন বহনকরা পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যে পিছু ছাড়েননি তিনি। এবার জিয়া পরিবারে বিশ্বস্ত সেই ফাতেমা হয়েছেন তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের ছায়াসঙ্গী।

বুধবার যখন খালেদা জিয়াকে দাফন করার জন্য উন্মুক্ত কফিন নিয়ে যাওয়া হয় তখন সেই কফিনের সঙ্গে ফাতেমাও হেঁটে যান কবর পর্যন্ত। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর মরদেহের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছেন, চোখ মুছে মুছেই শেষ বিদায়ের সকল প্রস্তুতিতে সহায়তা করেছেন।
শুক্রবার বেগম জিয়ার কবর জিয়ারতের সময় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে তিনিও ছিলেন। সেখানে ধারণ করা একটি ফুটেজে ফাতেমাকে দেখা গেছে জাইমা রহমানের সঙ্গে

Fatemaখালেদা জিয়ার হাত ধরে আছেন ফাতেমা। ছবি: সংগৃহীত

দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফাতেমা ছিলেন খালেদা জিয়ার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। বাসভবন ‘ফিরোজা’, গুলশানের কার্যালয়, রাজপথের উত্তাল মুহূর্ত, কারাগারের নিঃসঙ্গ প্রকোষ্ঠ, হাসপাতালের দীর্ঘ রাত কিংবা বিদেশ সফরের নীরব করিডোর—সবখানেই নিঃশব্দে উপস্থিত ছিলেন ফাতেমা। গৃহকর্মীর পরিচয় দিয়ে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছিলেন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

২০১০ সাল থেকে গুলশানের ‘ফিরোজা’য় দায়িত্ব নেওয়ার পর ধীরে ধীরে খালেদা জিয়ার দৈনন্দিন জীবনের নির্ভরতার জায়গায় পৌঁছান তিনি। চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের ভাষায়, ফাতেমার দায়িত্ব শুধু কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ওষুধ খাওয়ানো, সময়মতো প্রয়োজনীয় বিষয় মনে করিয়ে দেওয়া, শারীরিক দুর্বলতায় হাত ধরে রাখা— এসবই ছিল তার নীরব দায়িত্ব। এই দায়িত্বের ভেতরেই গড়ে ওঠে এক মানবিক সম্পর্ক, যা চাকরির সংজ্ঞা ছাড়িয়ে যায় অনেক দূর।

 

 লন্ডনেও খালেদা জিয়ার সঙ্গে ছিলেন ফাতেমা। ছবি: সংগৃহীত

ফাতেমার জন্ম ভোলার সদর উপজেলার কাচিয়া ইউনিয়নের শাহ-মাদার গ্রামে। রফিকুল ইসলাম ও মালেকা বেগম দম্পতির পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। খুব অল্প বয়সেই সংসারের ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। একই ইউনিয়নের কৃষক হারুন লাহাড়ির সঙ্গে বিয়ের পর জীবন চলছিল মেঘনার চরের সংগ্রামী বাস্তবতায়। দুই সন্তান—জাকিয়া ইসলাম রিয়া ও মো. রিফাতকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার সময়ই নেমে আসে দুঃসংবাদ। ২০০৮ সালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান তার স্বামী। তখন রিফাতের বয়স মাত্র দুই বছর। মুহূর্তে বদলে যায় জীবনের চিত্র।

স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে যান ফাতেমা। কিন্তু মুদি দোকানি বাবার সামান্য আয় সংসারের বোঝা টানতে পারছিল না। সেই বাস্তবতা তাকে বাধ্য করে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে—সন্তানদের গ্রামে রেখে কাজের খোঁজে ঢাকায় পাড়ি জমান তিনি। ২০০৯ সালে পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে কাজ পান খালেদা জিয়ার বাসভবনে। সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ সহযাত্রা, যা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে।

 খালেদা জিয়ার কফিনের সঙ্গে হাঁটছেন ফাতেমা। ছবি: ভিডিও থেকে

রাজনীতির উত্তাল সময়গুলোতেই ফাতেমাকে সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে খালেদা জিয়ার নীরব ছায়া হিসেবে। ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের প্রতিবাদে আন্দোলনের সময় গুলশানের কার্যালয়ের সামনে যখন খালেদা জিয়াকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়, তখন পতাকা হাতে পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফাতেমা। ২০১৫ সালের শুরুতে টানা ৯২ দিন গুলশান কার্যালয়ে অবস্থানকালেও তিনি ছিলেন সার্বক্ষণিক সঙ্গী।

২০১৪ সালের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচিতে ফাতেমা প্রথম আলোচনায় আসেন। গুলশানের বাসার সামনে বালুভর্তি ট্রাক দিয়ে পথরুদ্ধ। গাড়িতে উঠেও বেরোতে না পেরে ফিরোজার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের সামনে কথা বলছেন খালেদা জিয়া। পুলিশের চাপে শরীরের ভার সামলাতে পারছেন না তিনি। ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যামেরার ফ্রেমে ধরা পড়েন ফাতেমা-নীরবে, শক্ত করে ধরে রেখেছেন নেত্রীর হাত। রাজনীতির উত্তাপের মাঝেও সেটি ছিল এক মানবিক দৃশ্য।

২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি আদালতের রায়ে খালেদা জিয়া কারাগারে যান। নাজিমুদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগার। আইনজীবীদের আবেদনের পর আদালত অনুমতি দেয়, গৃহকর্মী হিসেবে ফাতেমা তার সঙ্গে থাকতে পারবেন। ছয় দিন পর কারাগারে প্রবেশ করেন ফাতেমা। রাজনৈতিক কোনো পরিচয় ছাড়াই স্বেচ্ছায় তিনি হয়ে ওঠেন কারাবন্দি। প্রায় ২৫ মাস তিনি কাটান কারাগারে, কারণ তিনি জানতেন-এই সময়ে একা থাকা মানে ভেঙে পড়া।

২০২১ সালে করোনা আক্রান্ত হয়ে খালেদা জিয়া ৫৩ দিন হাসপাতালে ছিলেন। যখন মানুষ প্রিয়জনের কাছেও যেতে ভয় পাচ্ছিল, তখন ফাতেমা ছিলেন অবিচল। সেবিকা হয়ে, সাহস হয়ে, ছায়া হয়ে পাশে ছিলেন তিনি। সর্বশেষ লন্ডনে উন্নত চিকিৎসার সময়ও ফাতেমা ছিলেন সঙ্গী। আলোচনায় নয়, ক্যামেরার সামনে নয়-কিন্তু সবখানেই উপস্থিত।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একবার কটাক্ষ করে বলেছিলেন, কারাগারেও খালেদা জিয়ার ফাতেমাকে লাগবে। সেই মন্তব্যই যেন প্রমাণ করে দেয়, ফাতেমা কেবল একজন গৃহকর্মী ছিলেন না-তিনি ছিলেন একজন অনিবার্য সঙ্গী।শেষ পর্যন্ত সেই ছায়াসঙ্গীকেই চিরবিদায় জানাতে হলো। এভারকেয়ার হাসপাতালে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত খালেদা জিয়ার পাশে ছিলেন ফাতেমা। দাফনের দিন কফিনের সঙ্গে হেঁটে কবর পর্যন্ত যান তিনি। কফিনের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতেই শেষ বিদায়ের সব প্রস্তুতিতে সহায়তা করেন। কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার ভাষ্য, খালেদা জিয়ার শেষ সময়গুলোতে সবচেয়ে ভেঙে পড়া মানুষগুলোর একজন ছিলেন ফাতেমা।

দেড় দশকের বেশি সময় ধরে নিজের পরিবার, সন্তান, ব্যক্তিগত জীবন-সবকিছু পেছনে রেখে তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন একজন মানুষের সেবায়। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই, কোনো পদ নেই-তবু ইতিহাসের কঠিন মুহূর্তগুলোয় তার উপস্থিতি ছিল অবিচ্ছেদ্য।

ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন খালেদা জিয়াকে ঘিরেই যার জীবন আবর্তিত ছিল, সেই ফাতেমা এখন হঠাৎ করেই এক শূন্যতায় পড়েছেন। তার দৈনন্দিন রুটিন, দায়িত্ব, এমনকি জীবনের উদ্দেশ্য-সবকিছুই নেত্রীর সঙ্গের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। বর্তমানে ফাতেমা বেগম শারীরিকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও মানসিকভাবে গভীর শোকে আচ্ছন্ন।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো খবর..

© All rights reserved © 2009-2022 bddhaka.com  # গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রনালয়ের বিধি মোতাবেক নিবন্ধনের জন্য আবেদিত # এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
Theme Developed BY ThemesBazar.Com