বিডি ঢাকা ডেস্ক
রাজশাহীর তানোরসহ প্রচন্ড খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলের ২৫টি উপজেলায় জলবায়ুর বিরুপ প্রভাবে ভয়াবহ পানি সংকট দেখা দিয়েছে।বিশুদ্ধ খাবার পানি ও সেচ নিয়ে মানুষের মাঝে এক ধরনের হাহাকার। পদ্মার দুকূল ছাপিয়ে বিশাল জলরাশি বয়ে যাচ্ছে বঙ্গপোসাগরের দিকে। রাজশাহী অঞ্চলের মহানন্দা, শিবনদী, পাগলা, ছোট যমুনা, আত্রাই, বারনই ও পূণর্ভবায় এখন পানির কমতি নেই। চলতি বর্ষায় পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় দেশের লালমাটির বরেন্দ্রভূমির খাল বিল খাড়ি ডোবাতেও পানি জমেছে। এরপরও বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন সময়ে বহুমূখী পানি সংকটে ভুগছেন। চিহ্নিত এলাকাগুলোতে ভূগর্ভস্থ পানি স্তর আশংকাজনকভাবে তলানিতে ঠেকেছে। অধিকাংশ হস্তচালিত নলকূপ কয়েক বছর ধরেই পুরোপুরি অকেজো। বছরের আট মাসই এলাকার খালবিল পুকুর ডোবা খাড়ি নালাতে পানি থাকে না।এদিকে উপদ্রুত এলাকার মানুষেরা খাবার পানি সংগ্রহ করতে অবর্ণনীয় দুভোর্গের শিকার হয়ে থাকেন। গৃহস্থালির দৈনন্দিন কাজকর্ম ছাড়াও গবাদিপশু পালন ও ফসল ফলাতে সেচের পানি পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠেছে।
জানা গেছে, পানি আইনের অধীনে দেশে প্রথমবারের মতো ৩টি অঞ্চলকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩-এর ধারা ১৭ ও ১৯-এর আলোকে বিস্তারিত জরিপ ও অনুসন্ধান শেষে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম হাইড্রোলজিক্যাল অঞ্চলের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার তিনটি অঞ্চলকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। এ অঞ্চলে মোট ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়ন (৪ হাজার ৯১১টি মৌজা)-এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নকে (১ হাজার ৫০৩টি মৌজা) অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। গত মঙ্গলবার তথ্য অধিদপ্তরের এক বিবরণী সূত্রে এ সব তথ্য জানা গেছে।
বিবরণীতে বলা হয়, ২৫ আগস্ট ঢাকার গ্রিন রোডের ওয়ারপো ভবনের সম্মেলনকক্ষে জাতীয় পানি সম্পদ পরিষদের নির্বাহী কমিটির ১৮তম সভায় এই তিনটি এলাকাকে সংকটাপন্ন ঘোষণা করা হয়। একইভাবে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন (১০৪টি মৌজা) ও একটি পৌরসভা (আটটি মৌজা)-এর মধ্যে তিনটি ইউনিয়ন (সাতটি মৌজা) এবং একটি পৌরসভাকে (পাঁচটি মৌজা) অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পানি আইন অনুযায়ী এসব এলাকায় পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা হবে। পাশাপাশি খাবার পানি, গৃহস্থালি কাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি কমিটি আগামী এক মাসের মধ্যে করণীয় চূড়ান্ত করবে। সভায় পানির প্রাপ্যতা যাচাই করতে নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচরে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা চালানোর সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে ৫০ জেলায় ভূগর্ভস্থ পানির প্রাপ্যতা যাচাইয়ে যে কার্যক্রম চলমান রয়েছে তা বাকি আরও ১৪টি জেলাতে শুরু করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
এছাড়া, সভায় আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জলাভূমি টাঙ্গুয়ার হাওর ও হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য এবং বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণের লক্ষ্যে বাংলাদেশ পানি আইন, ২০১৩-এর ধারা ২২ ও ২৭-এর ক্ষমতাবলে প্রথমবারের মতো ‘হাওর প্ররিবেশ সুরক্ষা আদেশ’ জারির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সুরক্ষা আদেশের অধীনে হাওর দুটিতে পর্যটন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কৃষি, মৎস্য ও বনায়ন খাতে করণীয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়, পানি আইন, ২০১৩-এর দুর্বল কার্যকারিতার ওপর আলোকপাত করে আইনটির প্রয়োজনীয় সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাছাড়া শিল্পখাতে পানি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে ‘পানি ব্যবস্থাপনা নীতি ২০২৫’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়।
নির্বাহী কমিটির সভাপতি পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের সভাপতিত্বে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোকাব্বির হোসেনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ও সচিবরা এবং অন্যান্য দপ্তর-সংস্থার প্রধানরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় পানি আইন, ২০১৩-এর কার্যকারিতার দুর্বলতা চিহ্নিত হয়ে সংশোধনের প্রস্তাব গৃহীত হয়, যা আইনের বাস্তবায়নে সফলতা বাড়াবে। পানি সংকটাপন্ন এলাকার অন্যতম রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার গোগ্রাম, মাটিকাটা, রিশিকুল, পাকড়ি ও মোহনপুর এবং তানোর উপজেলার পাঁচন্দর, বাধাইড়, তালন্দ, কলমা ও সরনজাই ইউনিয়ন (ইউপি)। অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন (ইউপি)।